আলী আফজাল খানের একগুচ্ছ কবিতা
আলী আফজাল খানের একগুচ্ছ কবিতা
লীলাবতী

 

-অতটা ঝুঁকো না নদীর দিকেকালো জলে নিজের মুখ দেখতে পাবে না...

-আমার প্রতিবিম্ব আলোর গঠন লীসবটাই তীর ছোঁড়াছুড়ি আলোআলোর প্রতিবিম্ব কি? নদীর জলে?

-সদ বিম্ব না অসদ, জানো?

-বিম্ব হয় সওওব অসদ হবে, নাহলে সব সদবিজ্ঞানের নুড়ি ভাষায় নদীর দোসর হয়ে যায়... আলাদা ...

-কথা বলে বলে সত্য উদঘাটন করা যায় বুঝি? আমরা তো আসলে মাথার মধ্যে বিন্দু গেঁথে আনিকানেক্ট করতে করতে কোন মুহূর্তে স্মরণাতীত বিদ্যুৎ ঘটে যায়... তার সৃজনকাল এত তীক্ষ্ম, যে মস্তিষ্ক তাকে ইন্দ্রজাল ভেবে খুশিতে উপচে পড়েআসলে তো দেখার বিদ্যুৎ ঘটে স্নায়ুতে

তুমি সরাসরি দেখছ না কেন, আলো?

-হুঁ….দেখো, দেখো লীলাবতী... কেমন জল ভেদ করে ভেতরে লী লী করছে স্রোতে ভেঙে ভেঙে যাওয়া আলোর ফলা...

আলোই কেবল নিজের প্রতিবিম্বে যাতায়াত করতে পারে...না??!

-হুঁ?? হুঁ

-কি ভাবছ?

-ভাবছি, আমরা বড়ো ছিনতাই হয়ে যাই অপরের দেখাতে

কখনো কি দেখেছিলাম, জীবদ্দশায়, সমুদ্রের আঁজলা করা মুঠোভর ফসফরাস আদৌ বিম্বিত হয় কিনা লোনাজলে?

দেখিইনি বোধহয়...

-আমিও দেখিনাআরো কম দেখি লীলাচারদিকে কেবল গরাদ আর গরাদএকটা একটা করে জানলা পরিয়ে দেয় গলায় সবাইজানালা স্বস্থানে অসীম দেয়, গলায় ঝুললে ফাঁস

-একেকটা পুঁথি একেকটা উপড়ানো জানালা স্বরা

শুনেছ,

দাস্তানে যা ভবি

দস্তানে তালাচাবি

-আমার নিজেকে নাড়াতে ভয় হয় লীলা...বুক জ্বালা করে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে

-জীবন এমন নয়

-সব কিছু কুরে কুরে খায় অন্তরতম...দিন রাত প্রেম অপ্রেম সব! কিছুতেই শান্তি আসে না, কিছুতেই...

-জীবন এমন নয়...

-আমার হাঁটু ঝাঁঝরা লীলা, আর্লি টোয়েন্টিন্থেআমি পাহাড় চড়ব কিভাবে? জীবন কেমন?

-দু মুহূর্ত তোমার শ্বাস থামিয়ে দিই যদি... প্রাণহীন... কে তুমি তবে?

-আমার পূর্বকর্ম?

-কেউ যদি বহন না করে? না সময় না মানুষ?

-আমি কে তবে?

-কই...কেউ না ! একটা দম দেওয়া ঘড়ি যতক্ষণ সময় দেয় ততক্ষণ সে থাকেনিজের পুরানো থাকা কুড়িয়ে ফসিলের দুর্গ গড়ে তাকে "আমি" জানালা পরিয়ে দু: খোঁজোমনগড়া নির্মাণ স্বরা

-জানালা হব?

-নিজের প্রতিবিম্বে যাতায়াত পাবে নাআলো নও তুমি

-জল?

-বর্ণহীন... পারবে?

-তবে?

-স্বরে বর্ণ নাওবাকে লেখো অবাকরাত্রি আঁধারিয়া হয়, স্তোত্রওবেছে নাও দেখা

প্রকৃত হও...প্রাকৃত অনুবাদের ধর্মজানালা হয়ো না স্বরা, যাতায়াত রুদ্ধ হয়ে যায়...



কাঁচা ঘটতে থাকা মানুষের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই

এসো

তুমিও তোমার না...তাই ভেবো না

আমি তুমি কেউ না আলী...একসঙ্গে ঘটা কয়েকটা ঘটনাচক্রের মাঝে একটুকরো সচেতনতা মাত্র

মনখারাপ করার জন্য যে সত্তা লাগে, সেটাও আমাদের নয়

উড়িয়ে দাও তুড়ি মেরে

কালকের সকালটাই আমাদের নয়, আমরা মানুষের আয়ু নিয়ে ভাবতে বসব?

যেটা একটা প্যারামিটার মাত্র

হাতের ঘড়িটাও ভ্রম... ঘড়ির কাঁটা... বছরের ভাগ

সব আমাদের তৈরি সচেতনতার পরিমাপ...

সিমেট্রি দেখলে আমাদের মানবমন শান্ত থাকে, রিপিটেশন দেখলে

সেসবের খেলনা আয়োজন

আমরা ভুলেই যাই পৃথিবীটা মানুষের না... ব্রহ্মাণ্ডটা....এই যে সাফল্য, ক্ষমতা, পারদর্শিতা, আর্ট-- এসব আমাদের তৈরি প্যারামিটার

আর্টও কিছু না আলী

খেলনা

এর নিরিখে আমাদের সত্তা, সারবত্তা, জীবনসার নির্ণীত হয় না

এগুলো আমাদের পুরস্কারও না

কালজয়ী, কালের বুকে বেঁচে থাকা, সব বুলশিট

পৃথিবীটা মানুষের না

মানুষের সর্বোত্তম প্রাপ্তি আর্ট না, বিজ্ঞান না

স্রেফ মানুষ

স্রেফ, একমাত্র মানুষ

 

যেটুকু সময় মানুষের সান্নিধ্যে থাকবে, জানবে কোটি আর্টের ফসিলের চেয়ে দামী সেসময়

পৃথিবীর বুকে সর্বোত্তম সচেতনতা মানুষ... তার সান্নিধ্য, তোমার গায়ে লেগে তার ঘটে থাকা

কে আমার, কে আমার কত কাছের, কতদিনের সঙ্গী সব বুলশিট

মানুষের সান্নিধ্য স্রেফ মস্তিষ্কের সংযোগ,

তাকে কুক্ষিগত করে রাখার ভাবনাটাই সবচেয়ে ক্ষতিকর

মানুষের সান্নিধ্যের যে অপার সম্ভাবনা,

এই কুক্ষিগত করে রাখার ভাবনাটাই বারবার গলাটিপে খুন করে তাকে

কাঁচা ঘটতে থাকা মানুষের চেয়ে সত্যি, সুন্দর প্রাপ্তি কিছু নেই আমাদের জন্য



বি- রঙ পাখী

 

সকালে এত পাখি আসত

বাঁধা কয়েকটা...পাশের রডে বুলবুলি এসে বসত, ল্যাজ গনগনে লাল...সোজ্জা চোখে তাকাত

বাঁশপাতিগুলো কান্নিক মেরে এদিকসেদিক উড়ত,ওরা চেনাপরিচিত না...রোজ এমনি আসত

দুর্গা টুনটুনি একটা...কত্ত কাছ ঘেঁষে...দেখেছ কখনও? ধাতব গ্লসি নীল

মৌটুসী তিনচারটে

আর গোলাপিবুক দুতিনটে ঘুঘু

কি অপরূপ ছিট বুকে, হাঁ করে দেখার মতো

জবাফুলের ভেতর সেঁধিয়ে যায় এত্ত ছোট

মৌমাছির ধর্ম নিয়েছেখুব সূঁচালো ঠোঁটে মধু ভরে খায়

রঙবেরঙ



ভাষাহীন আমিটাই কৃষ্ণ

 

পিয়া মোরে ন্যায়নন মে যো পলক ধাপ তোঁহে লুঁ না ম্যায় দেখুঁ কিসি অউর কো না তোঁহে দেখনে দুঁ

পিয়া আমার নয়নে এসো পলক ধাপ করে বন্ধ করে তোমাকে যে কয়েদ করে নেব, তারপর আমিও আর কাউকে দেখব না না তোমায় দেখতে দেব

আমাদের দুটো সত্তা...একটা ভাষা জানে, শিখিয়েছে জীবন...আরেকটা জানে না বেবাক

দুটো সজ্ঞানে মুখোমুখি খুব কম হয়...কখনও ছুরি আর মাংসের মতো একে অন্যকে কেটে চলে যায়... আমরা চোট অনুভব করি, যুদ্ধটা না

ভাবো, আমরা বাক্যে থিরালে ভাবি এই উপলব্ধি করলাম...কিম্বা বাক্যে চাপানউতোর হলে ভাবি দুজনের ঝগড়া হল, ভালোবাসা হল

আসলে যা হয়, অজস্র হয়, সব অজ্ঞাতে

 অহরহ হয় দিনরাত....ভাষার উপনিবেশ যেটুকু সত্তা, আমরা তাকে নিয়ে মত্ত

তাকে আমি ভাবি, অহং ভাবি...কি বোকামি...সেই কথায় আহত হই,সেই ভার জীবনে বয়ে চলি

কত বহিরঙ্গ সে

 

ভাষাহীন আমিটা কৃষ্ণ...আমার শিরা নিংড়ে নিজের বাঁশি তীক্ষ্ণ করে সে, আমার রক্তে গাঢ়

তাকেই চিনি না


স্বপ্ন/দোষ

তোমার বাড়ির সামনে একটা ভিন্টেজ কাঠের বাড়ি...তার দুটো খিলান দেওয়া দরজার ভেতর ওয়াগন ট্রেন চলে যায় কাঠের

তোমার দরজাটা কুঁচি দেওয়া ইস্পাতের...পাশে একটা তারজালি ঘেরা জায়গায় আরেকটা টয়ট্রেন...তাতে হলুদ রঙের দুটো মানুষ... একটা তুমি ছোটবেলার...আরেকটায় তোমার বাবা, হাফ বাঘ হাফ মানুষ

ছোটবেলার কোন একটা ঘটনা এভাবে স্মরণীয় করে রেখেছ তুমি

ভেতরে বেশ কজন মহিলা...একজন অদ্ভুত রূপোর গয়না পরে আছেন, গোল গোল মোহরের মতো ঝালর দেওয়া গলা থেকে কোমর অবধি একটা অলঙ্কার...আবার গলায় চিক রূপোর, তার মধ্যেই কলকাতা থেকে দুজন উঠতি কবি গিয়ে নক করেছে তোমার বাড়ি...চেনা চেনা লাগে...যত বলি, তোমাদের কলেজে দেখেছি না? তারা কোন এক বিশাল সম্পাদকের নাম বলে...তার বাড়িতে নাকি দেখেছি... যত বলি আমি ওসব ভারিক্কি কাউকে চিনি না, তত তারা বর্ণনা দিতে থাকে, উনি এই বিভাগের প্রধান, অমুকের হেড

তোমার বাড়ির সামনে একটা দারুণ কফিশপ আছে...দুজনে কফি খেয়েছি সেখানে

আর আমি বলার জন্য উসখুস করছি, যে আমাকে বাংলাদেশ ঘুরতে নিয়ে চল...আর দুদিন মাত্র বাকি..বাসে চেপে বেরিয়ে পড়ি, যেখানে ইচ্ছে

রাতে নাটক হবে ওখানে...দুজন বয়স্ক মানুষ মুখে তিন আঙুল মেক আপ লাগিয়ে বসে আছেন.. ওনাদের এন্ট্রি পরে

এর মধ্যে একজন হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন, ওনার নেক্সট এন্ট্রি, মেক আপ করে দিতে হবে

আমি তোমাকে করে দিতে বললাম, আমি তো জানি না... তোমার আম্মি করে দিলেন

তুমি পরে আম্মিকে বকছ, 'বলেছি না আড়াই প্যাঁচ মেকআপ করতে? এত বেশি দিলে কেন? যেটা দিচ্ছ সেটাও dilute করে দাও, জল মিশিয়ে...'

আর আমি মনে মনে ভাবছি, আলীটা এত কিপটে...জানতে পারিনি

ডাকনাম

না না, আড়াই প্যাঁচ হয় না..জিলিপিতে হয়

জানি , তাই ঘাবড়েছি

আচ্চা, সাঙ্গ হল শেষমেশ

 



সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান