চোরাবালি ।। ড. আনোয়ারা আলম
চোরাবালি ।। ড. আনোয়ারা আলম

"যার বিয়ে তার খবর নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই"-এমন একটা আবহ - উৎসব উৎসব আমেজে - মৌ মৌ আবেশে মগ্ন সবাই আঠারোর অনীক মালয়েশিয়া থেকে দেশে আর পনোরর রিনির চঞ্চলতা - পুরো বাড়িতে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন উপলক্ষ্য খুরশীদা বানু আর আনিস সাহেবের বিবাহিত জীবনের পঁচিশ বছরের পূর্তি আনিস সাহেবের উৎসাহে কমতি নেই অফিস থেকে ফিরে বা কাজের অবকাশে ছেলে মেয়ের সাথে বসছেন, অনুষ্ঠানকে ঘিরে নানা ধরনের পরিকল্পনা শহরের এক অভিজাত পরিবারের দাম্পত্য জীবনের পঁচিশ বছরের পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে হবে তো? আনিসুর রহমান - মধ্য পঞ্চাশেও বেশ সুদর্শন - ছয় ফুটের কাছাকাছি উচ্চতা, পেটানো শরীরে লালচে রঙের কিছুটা লাল আভা - দেখলেই চোখ টানে শহরের এক প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি

খুরশীদা বানু এই পঞ্চাশে- তরুণী সদৃশ দুধে আলতা গায়ের রং - লম্বাটে মুখ -ত্বক এখনো টানটান মসৃণ তবে তাদের বিয়েতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিলোধনী পরিবারের একমাত্র মেয়েকে কে বিয়ে দিতে চায় মধ্যবিত্ত পরিবারের পাত্রকে কিন্তু  মেয়ের জেদের কাছে হার মানতে হয়েছে  মেধায় চৌকশ আনিস বিয়ের পরে বছর কয়েকের সংগ্রামে শহরের প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যবসায়ী সবদিক থেকে একেবারে পরিপূর্ণ সুখী পরিবার

আনিস সাহেবের ব্যবসায়িক জীবনের সূর্য যখন মধ্যগগনে - খুরশীদা বানু কলেজের চাকরি ছেড়ে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক

 

জম্পেশ আড্ডার মাঝে সিকিউরিটি গার্ডের ফোনকারো একজনের হাতে একটা প্যাকেট ফুলের তোড়া" ম্যাডামের হাতে দেবেন"টুকটুকে লাল গোলাপের একটা ব্যুকের সাথে ছোট একটি প্যাকেট কিছুটা বিষ্ময়ে খুরশীদা কাছের কাউকে কি আমন্ত্রণ জানানো হয় নি! প্যাকেট খুলতেই ঘিরে রেখেছেন আশপাশের নারী অতিথিরা আগ্রহ তাদের বেশি ততক্ষণে প্যাকেটের ভেতরের জড়োয়া সেটের রুবী পান্না আর হীরার জড়োয়া সেটের আলোতে সবার মুগ্ধতার মাঝে প্যাকেটের একেবারে কোণায় ছোট চিরকুট টা আলগোছে তুলে নিলেন খুরশীদা

" সুইট হার্ট - লক্ষীটী - দিন কয়েক আসা হলো না অভিমান রেখো না আগামীকাল সব পুষিয়ে দেব ছোট্ট এই উপহার তোমার জন্য"

আনিস

মূহুর্তেই সব ঝাপসা নিজেকে এতো অবসন্ন আর অপমানিত লাগছেওহ্! কি বোকাকি বোকা তিনি এরপরে দীর্ঘক্ষণ পরে অন্য এক খুরশীদা খোলা চুলে লাল পাড় তসরের শাড়িতে অন্য এক খুরশীদা আশপাশের কলকাকলি - সানাইয়ের সুর - আলোকজ্জ্বল রাত- হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় থমকে গেছে

এর মাঝে এসে গেছে আনিস স্ত্রীর সামনে নতজানু হয়ে " হ্যাপি ম্যারেজ ডে টু ইয়ু"চারপাশে করতালি, আবারো অভিনন্দন বাণী, ফুলের পাপড়ির মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাতাসে

হঠাৎ দৃষ্টিতে স্ত্রীর নিরাভরণ গলা

" খুশি! গলা গালি কেন?"

সাথে সাথে কলকলিয়ে আশপাশের নারী অতিথিরা

" আনিস ভাই সন্ধ্যায় দেখলাম - আরেকটি সেট আরেকটি কেন? ভাবী বোধহয় ঠিক করতে পারছেন না - কোনটি আপনার পছন্দ হবে তাই তো এখন গ্লানি খালি"

খুরশীদা বানু কিন্তু হাসছেন অতঃপর স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলেন - " কি করবো ডার্লিং দুই দুটো সেট কোনটা রেখে কোনটা পড়ি তুমি ঠিক করে দাও"

পলকে সুদর্শন স্বামীর লালচে অবয়বে এক অসহায় পান্ডুর ছায়া

পলকে নিজেকে সামলে নিয়ে " হো - তাই তো আরো আগে পাঠানোর কথা ছিল"

এরপরেই মিশে গেলেন অতিথি আর বন্ধু বান্ধবের ভীড়ে

মধ্য রাতের সুনসান নীরবতা - একাকী বারান্দায় খুরশীদা আনিস - নিজের ঘরে একাকী নিজেকে কি প্রস্তুত করছেন - কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি নাকি বিশ্বাসঘাতকতার জবাবদিহিতা

আর খুরশীদা! অগ্নিকুণ্ডের মতো হজম করছেন বুঝতে পারলেন - চোরাবালিতে ডুবে গেছে এতো দিনের দাম্পত্য সম্পর্ক তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে পঁচিশ বছরের যৌথজীবন এতো এতোটা বছরের ভালোবাসার সম্পর্কে কিভাবে ঢুকে গেল আরেকজন

একি বিশ্বাসঘাতকতা! ভেতরে জ্বলছে ক্ষোভ,রাগ, দুঃখ,রাগ আর অভিমান এরপরে নিস্তব্ধ প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে নিজেকেই বলেন -" আনিস - তুমি আর আমার তবে কিছুই হারাই নি আমিজয়ী হতে হবে নিজেকে নিয়ে - আজ থেকে আমি একা এবং সম্পূর্ণ একা"

 

 

 

সব চলছে নিয়মমাফিক - কিন্তু মাস ছয়েক হলো এতো দিনের ঘোর লাগা দাম্পত্য জীবনের হঠাৎ যেন এক অদৃশ্য ছন্দপতন আনিসের মাঝে একটা পরিবর্তন বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও খুরশীদা অনুভব করছেনআগে অফিসের কাজে ব্যস্ততা থাকলে যেভাবে হোক রাত নয়টার মধ্যে বাড়ি ফেরা- এরপরে রাতের খাবারের পর বাইরের ঝুল বারান্দায় - নানা ধরনের আড্ডা - খুনসুটি - মাঝেমধ্যে মেয়ে দুজনের মাঝে

রাতে নিত্য না হলেও আনিসের শারীরিক সান্নিধ্যে - ভালোবাসার উষ্ণতায় মধ্য বয়সের নারীর শারীরিক শীতলতা কেও আনিস জাগিয়ে তুলতেন আদরের উষ্ণতায় খুরশীদার ভেতরটা তখন অপরূপ আবেশে স্বর্গীয় এক ভালোলাগায় মনে হতো -" হামিনাস্ত - হামিনাস্ত"- এখানেই স্বর্গ - এখানেই স্বর্গ"

সেই মানুষটি যেন অন্যরকম - ফিরছে নিত্য দেরিতে - সপ্তাহে নিত্য কমপক্ষে দুই দিন ট্যুরে

নদীর গতিপথ হয়তো বদলানো যায় -, কিন্তু মানুষের গভীরে অন্য যে মন- যা জাগিয়ে তুলেছেন আনিস- তাকে যে বশে আনতে কখনো কখনো কষ্ট হয় খুরশীদা যখনি জড়িয়ে ধরছেন আবেগে- আনিসুরের মাঝে ক্লান্তির সুরথ" খুশি - কাজের এতো চাপ!"- নিরব অপমানে বিব্রত খুরশীদা তবে কি চাঁদে গ্রহ লেগেছে? অজানা এক আতঙ্ক খুরশীদার ভেতরে

 

 


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান