একগুচ্ছ কবিতা । গোলাম কবির
একগুচ্ছ কবিতা । গোলাম কবির
বিবাগী বাউল হয়ে ওঠা আর হলো না


ভোরের মিষ্টিআলো নরম ডিমের কুসুমের মতো

 চুইয়ে পড়ে জানালা গলে, চোখ খুলে মনেহয়

 শুনতে পাচ্ছি বিসমিল্লাহ খাঁর সানাই৷

 

 জীবনানন্দ দাশের কবিতার নদীরা

 সব ডাঙায় উঠে আসে সারি বেঁধে

 মিছিল করতে করতে!

 

 মন ছুটে যায় পাগলের মতো

 বাড়ির কাছে আরশিনগরের পড়শীর মতো

 তোমাকে দেখার জন্য!

 

 হৃদগহীনের সব দরজা খুলে অধীর আগ্রহে

 অপেক্ষা করতে করতে অদ্ভুতআঁধারের মতো

 ভুতুড়ে সন্ধ্যা নামে শহরের বুকে!

 

 জলজ সাপের মতো ধীরে ধীরে

 সন্ধ্যা অন্তর্লীন হয়ে রাত গভীর হলে

 হৃদয়ে ফিরে আসে গোরস্তানের নিস্তব্ধতার সাথে

 বিশাল শূন্যতার হাহাকার, একাকার হয়ে যায়

 চরাচর গহীন আঁধারে, বিসমিল্লাহ খাঁর সানাই

 একটানা করুণ সুরে বাজতে থাকে

 বধুবিদায়ের পরেও যেমন বরের বাবা

 এক বিশাল শূন্যতার হাহাকার নিয়েও

 স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে, তেমনি কল্পনায়

 তোমার নরম গালে আমার মতো

 নাদান ডুবুরির চুম্বনচিহৃ এঁকে দিই!

 

 ততক্ষণে সানাইয়ের সুরে ভেসে যায়

 হৃদয়ের ঘরবাড়ি, সংসার! 

 বিবাগী বাউল হয়ে ওঠা আর হলো না !


 কবি


এমনিতেই হৃদয় ভাঙা মানুষ,

 দুঃখ তাই নিত্যসঙ্গী চা গাছের

 একটি কুঁড়ি দুটি পাতার মতো!

 

 তবুও কেনো যে মাঝেমধ্যে জংধরা ছুরিকে

 যেমন শান দিলে আবারও প্রকৃত ছুরি

 হয়ে ওঠে আকৃতি স্বভাবে তেমনি করেই

 দুঃখের প্রবল বর্ষা নামে ,

 চৌদিক ভাসিয়ে নিয়ে যায় হৃদয়ের একূল ওকূল! 

 একাকী দীর্ঘ রাতের কোলে মাথা রেখে

 জেগে থাকে একটা কানা প্যাঁচা, উধাও ঘুম!

 

 কবিতা লেখার খাতার পাতা অজস্র ঝরে পড়া

 বটের হলুদ পাতাদের মতো পড়ে থাকে

 যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে, কোনো পাতায়

 হয়তো মাত্র দুটো শব্দ লিখেই শেষ,

 কেটে ফেলা হয়েছে শব্দ দুটি এবং পরে

 কবিতা আসছে না মাথায় বলে পুরো পাতাটাই

 ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে আবার কখনো একটা

 কবিতা লেখার পরে পুরো কবিতাটাই

 কেটে পাতাটা ছিঁড়ে কুটি কুটি করে

 ফেলে দেয়া হয়েছে কবিতায় যা বলতে

 চাওয়া তা বলা যায় নি বলে গভীর অসন্তোষে!


 আমি এবং তুমি


 আমার ভিতরে কে আমি?

 নিজেই তো চিনতে পারিনি এখনো!

 তাই হয়তোবা তোমাকেও চিনতে 

 ভুল করে ফেলি বারবারই!

 

 তুমি থাকো হৃদয়ের গহীন কন্দরে

 তবুও চিনতে কেনো যে 

 এতো ভুল হয়ে যায়!

 

 তুমি কী আমার খুব কাছের নও?

 তাহলে ভুল হয় কেনো চিনতে?

 

 কবে যে আমার ভিতরের আমিকে চিনবো!

 সেদিন হয়তো তোমাকেও চিনে ফেলবো

 হে মহান, হে প্রেম আমার!



বুকের আলমারি

বুকের আলমারিতে থরে থরে

সাজানো আছে তোমার দেয়া দুঃখগুলো!

 

 অবহেলা, উপেক্ষা আর কথা দিয়ে

 কথা না রাখতে পারার কষ্টগুলো কী ভীষণ

 সুন্দর করে সাজানো আছে মেডেলের মতো!

 

 আরো অনেক বেশি সুন্দর করে

 সাজানো আছে ভালোবাসার জন্য

 নিজের সর্বস্ব উজাড় করে প্রতারিত হবার 

 স্মৃতির অ্যাকাউন্ট বোনাস সহ!

 

 আছে অপেক্ষার দীর্ঘতম নদীর জল

 ভাটির টানে ফিরে যাবার দীর্ঘশ্বাস!

 আছে বৃষ্টিভেজা রাতে মনউদাস করা

 হৃদয়ের কষ্ট, আছে শুধু তোমাকে একটু

 দেখার জন্য ভীষণ তৃষ্ণার্ত হরিণের ক্লান্তিময় 

 মূহুর্তের কষ্টের স্মৃতি , আছে নির্ঘুম

একাকি রাতের নির্জনতার স্বাক্ষী কালি পড়ে যাওয়া

 বিবশ ম্লানমুখ, আছে তোমার সুন্দরতম 

 হাসিমুখ দেখার সুখকর স্মৃতি!

 

 বুকের আলমারিতে আরো আছে

 হৃদয় পুড়ে মাইলাই হয়ে যাবার

 স্মৃতির ছাইভষ্ম!

 

 সেসব কিছুই হারিয়ে যেতে দিই নি,

 এসব নিয়ে বেদনার সাম্রাজ্যে আমাকে

 একরকম রাজাধিরাজ বলতে পারে যে কেউ,

 আমারও তাতে আপত্তি নেই বিন্দুমাত্র!

 শুধু তোমাকেই হারিয়ে

 একদম নিঃস্ব হয়ে গেছি!


 কোনো এক বিকেলে

 কোনো এক বিকেলে এসেছিলাম একটুখানি

 স্নিগ্ধ কোমল কাদামাটির গন্ধ প্রাণভরে

 টেনে নিতে আপাতদৃষ্টিতে যে নদীটাকে দেখে

 মনেহয় প্রাণবন্ত উচ্ছল চঞ্চল কোনো কিশোরী

 কিন্তু তার খুব কাছে গিয়ে

 সে ভুল ভেঙে গেছে বলে আমিও

 নদীটার মতো বিষণ্ন ভীষণ!

 

  যেনো কোনো এক সার্কাসের ক্লাউন,

 যার কাজ শুধু দর্শককে হাসিয়ে

 আনন্দে মাতিয়ে রাখা অথচ

 নিজের ঘরের উনুনে চড়ে না বহুদিন যাবৎ

  কয়েক খন্ড লাল মাংসের টুকরো! 

 ক্ষুধার্ত চোখের সামনে যা দেখলে মনেহয় 

 যেনো মহা মূল্যবান কোহিনূর হিরা!

 

 তেমনি রাস্তায় হাঁটতে বের হলে

 এতো যে মানুষ দেখি তারা সবাই

 অবয়বে অবিকল মানুষের মতো!

 মাথা থেকে শুরু একদম দুই পা পর্যন্ত

 মানুষ অথচ যেটুকু মানবিক বোধ থাকলে 

 তাকে ঠিক মানুষ বলা যায়

 তার অভাব ভীষণ!

 

 ওদের কারো মধ্যে সুপ্ত অহংকার,

 কারো ভিতরে ধর্ষণকামী মনোভাবের প্রকাশ

 সুযোগ পেলেই খরস্রোতা নদীর মতো

 প্রবল বেগে ধেয়ে আসবে,

 কেউ হয়তোবা সুযোগ পায় নি তাই

 সৎ হিসেবে গর্বিত বোধ করে,

 কেউ কেউ অন্য কারো ভালো

 সহ্যই করতে পারে না শুধু তার সামনে

 মুখে মুখে বলে, বেশ, আলহামদুলিল্লাহ!

 এসব কথা ভাবতে ভাবতে

 বিষণ্ণ নদীটার মতো ততোধিক

 বিষণ্ন হৃদয়ে ফিরে এলাম আপন ঠিকানায়!


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান