শেফ রব্বানী আর তান্দুরী শেফ আলি,দু’জনেই বেশ একটা ফুর্তির ভাব নিয়ে কথা বলছে।
বেলা প্রায় পাঁচটা।বিকেল।সাড়ে চারটায় কাজ শুরু করেছি।হুভার,মফ,টেবিল সেটিং শেষ করে এখন ম্যাংগো চাটনি-ভ্যারল থেকে একটি ঘিয়ের বালতি নিয়ে,আঙ্গুল দিয়ে টিপে টিপে-ম্যাংগোর টুকরা গুলোকে ছোট করছি।
অন্যান্য রেস্টুরেন্টে দেখেছি ম্যাংগো চাটনির সাথে সামান্য ফুড কালার দিয়ে,পানি মিশিয়ে মেশিন দিয়ে ব্ল্যান্ড করে নেয়।এ রেস্টুরেন্টের বসের নির্দেশ-কালার টালার অথবা মেশিন না,সামান্য পানি মিশিয়ে,হাত দিয়ে মিক্সিং করে নিতে হবে।
আমি কিচেনের সিন্কের বালতি রেখে তা-ই করছিলাম।
অন্য পাশে,কুকারের কাছে,কুকিং করতে করতে নিজেদের মাঝে গল্প করছিলো শেফ রব্বানী আর আলি....
গল্পের এ পর্যন্ত লিখতেই দেখি ঘুমে আমার দু’চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।বাকী অংশ ‘ঘুম কি বাদ’লিখবো বলে মোবাইল রেখে ঘুমে তলিয়ে গেলাম।
পরদিন আবার লিখতে যেয়ে দেখি-গল্পের মূল বিষয়টাই ভুলে বসে আছি।কিছুতেই মনে করতে পারছিনা-শেফ রব্বানী আর আলি কি নিয়ে কথা বলছিলো!আর আমি ই বা কি বলেছিলাম!
পুরো বিষয়টাই দেখি আমার মগজের মেমোরি থেকে ডিলিট হয়ে গেছে!
অথচ আমার গল্পের প্লটটাই ছিলো ঐ দুই চারটি কথার উপর ভিত্তি করে।
আমি ঘন্টা দুয়েক অনেক চেষ্টা করেও ঐ বিষয় বস্তু আমার মেমোরিতে আর রি-লোড করতে পারলাম না।
কঠিন এক কষ্টে নিপাতীত হলাম।
শেষে গিয়ে আলির শরণাপন্ন হলাম।
তাকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করলাম,
- আলি কাল যে তুই আর রব্বানী আলাপ করছিলে,আমিও একটা কথা বলেছিলাম-তোর মনে আছে?
আমার কথা বলার মাঝে হয়তো অস্থিরতা ফুটে উঠেছিলো।সে তা ধরতে পারলো।তাই ব্যাটা বদ,তার বিশ্রী হাসিটাকে আরো বিশ্রী ভাবে প্রকাশ করে বললো,
- তুমি ভুলে গেছো?
- হু।
- হে হে হে,আর বেশিদিন না।
- কি ‘বেশি দিন না’নিয়ে কথা হয়েছিলো?
- হে হে হে হে।
বদটা আরো শব্দ করে হাসতে লাগলো।
কষ্টের সাথে এবার আমার রাগ যোগ হলো।তারপরও নিজেকে আমি নিয়ন্ত্রণে রেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইলাম।
হাসতে হাসতেই সে বললো,
- বেশি দিন নিয়ে কথার কথা বলছি না,বলছি তোমার পাগল হয়ে যাবার আর বেশি দিন না।
আমাকে পাগল বলছে!
আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি!
তা তার মতো লোকের সাথে থাকলে পাগল তো হবোই।
আমি আমার রাগটাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে
বললাম,
- পাগল বিষয় নিয়ে পরে কথা হবে আলি,এখন কালকের বিষয়টা নিয়ে কথা বল।
- হে হে হে,আমি কেন বলবো?তুমি মনে করার ট্রাই করো।
- ট্রাই তো সারাদিন ধরে করছি,পারছি না।তুই ই মনে করিয়ে দে।
- না দিবো না।
- কেন?
- আমি মনে করে দেই আর তুমি তা নিয়ে গল্প একটা ফেঁদে বসো!হে হে হে,আজ আমি তোমাকে সে সুযোগ আর দিচ্ছি না।
আলি চলে গেলো।
যাবার সময় আরো অদ্ভুত শব্দে হাসলো।
ব্যাটা বদ আমাকে দেখি পাগল বানিয়েই ছাড়বে!
অপ্রত্যাশিত
- তুমি নাকি দেশে যাচ্ছো বাবর ভাই?
দরোজা খুলতেই আলির প্রশ্ন।
আজ সে না জানিয়েই আমার বাসায় এসে দরোজায় নক করেছে।
তার প্রশ্নে আমি ভীষণ অবাক হলাম।
জীজ্ঞাসা করলাম,
- কে তোকে বললো-আমি দেশে যাচ্ছি?
আলি ঘরে ঢুকে জুতা খুলতে খুলতে বললো,
- আমার এক বিস্বস্থ সূত্র থেকে জানতে পেরেছি বাবর ভাই।
বিশ্বস্ত সূত্র- আবার কি?বুঝতে পারলাম না।
আমরা ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসলাম।
আমি জীজ্ঞাসা করলাম,
- তোর ঐ বিশ্বস্ত সূত্রটা কে?
আলি তার সবগুলো দাঁত বের করে হাসলো।
বললো
- সে তো তোমাকে বলা যাবে না।তুমি যে রবিবারে দেশে যাচ্ছো সে কথা বলেছো আমাকে?
- কি বলছিস আলি!আমি যে দেশে যাচ্ছি তাতো নিজেও জানিনা!তোকে বলবো কি করে?
আলির মুখে তার বিখ্যাত বিশ্রী হাসি।
বুঝাই যাচ্ছে-আমি যে দেশে যাচ্ছি না,সে কথা সে বিশ্বাসই করছে না।
এর মাঝে আমার ওয়াইফ আমাদের জন্য চা,আর নাস্তা নিয়ে এলো।চায়ের কাপ টেবিলে রাখতে যেয়ে খেয়াল করলাম,একটা পলিথিনের ব্যাগে বড়ো একটা বক্স আলি নিয়ে এসেছে।
জীজ্ঞাসা করলাম,
- এই বক্সে কিরে আলি?
- দুইটা মোবাইল আর কয়েক টি ন সার্ডিনস।তোমার সাথে দেশে দেওয়ার জন্য এনেছিলাম।
- ও আচ্ছা।মোবাইলের বিষয়টা তো বুঝলাম কিন্তু সার্ডিনস কেনো রে আলি?দেশে সার্ডিনস পাওয়া যায় বলেই তো জানি।
- দেশে মোবাইলও তো পাওয়া যায়।
- তা ওতো কথা!
- আম্মা বলছিলেন দেশে যে সার্ডিনস পাওয়া যায় তা একেবারে অখাদ্য।সার্ডিনস আম্মার খুব প্রিয় তাই দিতে চেয়েছিলাম।
- ও হো...তুই তাহলে কার্গো করে পাঠিয়ে দে।
- তুমি তাহলে নেবে না?
আলি আহত স্বরে বললো।
এরে আমি কি করে বুঝাবো যে সত্যি সত্যিই আমি দেশে যাচ্ছি না!
বললাম,
- চা খা আলি।আর বিশ্বাস কর সত্যিই আমি দেশে যাচ্ছি না।
আলি চুপ করে রইলো।তার ভাব দেখেই বুঝতে পারছি-সে আমার কথা বিশ্বাস করছে না।
আমি আবারো জীজ্ঞাসা করলাম,
- তোর বিশ্বস্ত সূত্রটা কে তাতো বললে না আলি?
আলি কোনো কথা বললো না।তার দৃষ্টি আমার ড্রয়িং রুমের অন্য পাশে ডাইনিং টেবিলের দিকে।
সেদিকে দৃষ্টি রেখেই আলি বললো,
- তুমি তাহলে দেশে যাচ্ছো না?
- বললাম তো,না।
- ওটা তবে কি?
- কি তবে কি?
আলি এবার হাতের ইঙ্গিতে দেখালো।
লক্ষ্য করলাম,ডাইনিং টেবিলের পাশে রাখা স্যুটকেসটাই সে দেখাচ্ছে।
দু’দিন আগে ওয়াড্রোব গুছাতে গিয়ে দেখি শার্ট আর টি শার্ট জমে জমে বেহাল অবস্থা।বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দোকানে যখন যা পছন্দ হয়েছে কিনে এনেছি।কিছু কিছু পরেছি-বেশির ভাগই পরা হয়নি।
ইদানীং স্বাস্থ্য অনেক কমে যাওয়ায় কিছু দিন আগের কেনা শার্টও দেখলাম শরীরে বড়ো হয়ে গেছে।মনটা খারাপই হলো।
সেই সব শার্ট আর টি শার্ট একটা স্যুটকেশে ভরে রেখেছি-ভবিষ্যতে যদি স্বাস্থ্য ভালো হয় তখন পরবো।না হলে চ্যারিটি কোনো শপে নিয়ে দিয়ে আসবো।
আলি ঐ স্যুটকেস দেখেই ভেবেছে-আমার সব গুছানো হয়ে গেছে দেশে যাওয়ার জন্য।অথচ তার কাছে অস্বীকার করছি!
আমি হাসলাম।
বললাম,
- ওটাতে আমার পুরনো সব কাপড় ভরে রেখেছি আলি,ওয়াড্রোবে জায়গা হচ্ছিলো না।
আলি কোনো কথা বললো না।তার মুখের ভাবই বলে দিচ্ছে-সে আমার কথা বিশ্বাস করছে না।
এর মাঝে আমার স্ত্রী এসে জীজ্ঞাসা করলো,
- ভাত এখনি দিয়ে দিবো?
আমি আলির দিকে তাকালাম।
সে বললো,
- না ভাবী আজ ভাত খাবো না,আমাকে এখনই উঠতে হবে।
আমি বললাম,
- খেয়ে যা আলি,আজ তোর প্রিয় একটা জিনিষ রান্না করা আছে।
- তুমি তো কখনো তোমার বার্থ ডে পার্টিতে আমাকে ইনভাইট করোনা।এবারও করবে না জানি।কিন্তু আমার মন চাচ্ছে তোমাকে কিছু একটা গিফট করি।তুমি তো আমার গিফট ও রাখবে না,এর জন্যই এতো কিছু করতে হলো।