শহীদ কাদরীঃ নগর নিঃসঙ্গতা ও যন্ত্রণার কবি - আনোয়ার মল্লিক
শহীদ কাদরীঃ নগর নিঃসঙ্গতা ও যন্ত্রণার কবি - আনোয়ার মল্লিক

শহীদ কাদরীর জন্ম ( ১৪ আগস্ট, ১৯৪২ খ্রি) তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা নগরীতে। কলকাতা নগরী তখন হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার নিষ্ঠুরতা , দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা এবং তেতাল্লিশের মন্বন্তরে নিপতিত  অনাহার ক্লিষ্ট মানুষের পদভারে  বিদীর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকারাচ্ছন্ন এক নিরানন্দ, সন্ত্রস্ত রাতে কবির জন্ম। তিনি জন্মেই দেখেছেন আনন্দ কোলাহলময় পার্ক কাঁটাতারে ঘেরা। সারি সারি তাবু, সৈনিকের কুচকাওয়াজ, জ্বলজলে গম্ভীর কামান, ঘরবাড়ি গাছপালার চিরাচরিত রুপ বদলে গিয়ে  রণাঙ্গনে পরিনত। অর্থাৎ চারদিকে এক   যুদ্ধংদেহি আবহ।

কবি বলছেন  :

"জন্মেই কুঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে -

সোনালি পিচ্ছিল পেট আমাকে উগরে দিলো যেন

দীপহীন  ল্যাম্পপোস্টের নীচে,সন্ত্রস্ত শহরে

নিমজ্জিত সবকিছু রুদ্ধচক্ষু সেই ব্ল্যাক-আউটে আঁধারে।" ( উত্তরাধিকার, উত্তরাধিকার)।

       কলকাতা নগরে শহীদ কাদরীর শৈশব কাটেছে। কিন্তু সাতচল্লিশের   দেশভাগ তাঁকে উদ্বাস্তুÍ করে দেয়। ১৯৫২ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে কলকাতার পার্ক সার্কাসের  প্রিয় বাড়ি ছেড়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনি  ঢাকা চলে আসেন । ঢাকাতে তখন উদ্বাস্তু মানুষের ঢল। তাদের দুঃখ-দূর্দশা নিজ চোখে  প্রত্যক্ষ করেন তিনি। একদিকে নিজের শৈশবের চেনা পরিমন্ডল থেকে বিচ্ছেদ, অন্যদিকে অচেনা ঢাকার উদ্বাস্তুু জীবনের অমানিশা কবিকে বিপন্ন করে তোলে। এক ধরনের অস্থিরতা গ্রাস করে কবি হৃদয়কে। শৈশব কৈশোরের এই যন্ত্রণা তিনি আজীবন ভুলতে পারেননি ; জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বয়ে বেড়িয়েছেন। ফলে জীবনের কোনো কিছুতেই তিনি থিতু হতে পারেননি। লেখাপড়ায় তাঁর মন বসেনি। চাকরিতেও কোনো সাফল্য পাননি এবং গৃহী- জীবনও তাঁকে কাছে টানতে পারেনি। এছাড়া তাঁর কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছিলোনা। ঢাকার অলিগলি, ফুটপাত, রেস্তোঁরা ছিলো তাঁর ঠিকানা। কাদরীর এই ছন্নছাড়া, বোহেমিয়ান জীবনের চিত্র উঠে এসেছে এভাবে :

সভয়ে দরজা খুলি - এইভাবে দেখা পাই তার - মাঝরাতে ;

জানি না কোথায় যায় কি করে, কেমন করে দিনরাত কাটে

চাকুরিতে  মন নেই, সর্বদাই রক্তনেত্র,শোকের পতাকা

মনে হয় ইচ্ছে করে উড়িয়েছে  একরাশ চুলের বদলে।

 না, না  তার কথা আর নয়,

সেই বেরিয়েছে সকাল বেলায় সে তো- শহীদ কাদরী বাড়ি নেই।

(অগ্রজের উত্তর, উত্তরাধিকার)।

 

     শহীদ কাদরী স্বল্পপ্রজ কবি। সর্বসাকুল্যে  মাত্র চারটি কাব্যগ্রন্থ তাঁর। যেমন : উত্তরাধিকার ( ১৯৬৭), তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা ( ১৯৭৪), কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই (১৯৭৮)।এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালীন প্রকাশিত হয় তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ  আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও (২০০৯)। চারটি কাব্যগ্রন্থে কবিতার সংখ্যা ১২২টি। এবং গ্রন্থগুলোর বাইরে আরও চারটি কবিতা তিনি রচনা করেন। অর্থাৎ সমগ্র জীবনব্যাপী  মাত্র ১২৬ টি কবিতা লিখেছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে তাঁর একটি কৈফিয়ত হলো কবিতায় তিনি পুনরাবৃত্তি রোধ করতে চেয়েছেন । তিনি মনে করতেন, বেশি লিখলে বলা কথাই কবিতায় বার বার চলে আসে।

 

      তিরিশের আধুনিক কবিগন বাংলা কবিতায় যে নতুন প্রকরণ এবং ভাষার জন্ম দিয়েছিলেন, সাতচল্লিশের দেশভাগের পরে পঞ্চাশের দশকে এসে ঢাকাকে কেন্দ্র করে এই বাংলায় তার অভিঘাত আমরা লক্ষ্য করি। তিরিশি সেই কাব্য আন্দোলনের অনুপ্রেরণা ছিলো ইউরোপীয় আধুনিক কাব্য ভাবনার নির্যাস বাংলা কবিতায় ধারন করা। ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার ছিলেন পাশচাত্যে আধুনিক কবিতার পদপ্রদর্শক। তাঁরই পথ ধরে ইংরেজি কবিতায় ডব্লিউ বি ইয়েটস রোমান্টিক যুগের যবনিকা টেনে দেন। যদিও রোমান্টিক মনন এবং মানসে লালিত হয়েই তিনি কাব্য সাধনা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে কবি টি এস এলিয়ট এবং এজরা পাউন্ড, ইংলিশ কবিতার এই মহান দুই দিকপাল আধুনিক ইংলিশ কবিতার ভিত্তি রচনা করেন। আধুনিক কবিতার এই অভিঘাত ইউরোপের অন্যান্য ভাষায়ও সঞ্চারিত হয়। রাইনার মারিয়া রিল্কে কবিতার এই আধুনিকতাকে জার্মান ভাষায় ছড়িয়ে দেন। ১৮৫৭ সালে বোদলেয়ারের 'লে ফ্ল্যর দ্যু মাল' (  The Flowers of the Evils)  প্রকাশিত হলে প্রবল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তিনি প্রচলিত ফর্মকে বাতিল  করে  কবিতায় নতুন প্রকরণ, বিষয়বস্তু এবং ভাষা  নিয়ে আসেন। তিনি কবিতার বিষয় হিসেবে তুলে আনেন নাগরিক জীবনের জটিলতা, সমাজের অবক্ষয়,পাপ - পুণ্যের দ্বন্ধ্ব,কুৎসিতের মধ্যে সৌন্দর্যের সন্ধান, বিচ্ছিন্নতা এবং শহুরে  জীবনের বীভৎসতা। এমনকি ঈশ্বরের নিন্দা,ঘৃণা এবং মদ ও গণিকাকেও তিনি কবিতার বিষয় করে তোলেন। ফরাসি প্রতীকবাদ আধুনিক কবিতায় নতুন সম্ভাবনা  নিয়ে আসে। তবে শুরুতে   বোদলেয়ারের নিরীক্ষাকে খারিজ করা হলেও পরবর্তীতে সেই নিরীক্ষাই ফরাসি কবিতায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করে এবং সারা পৃথিবীতে  তা ছড়িয়ে যায়।

 

        শহীদ কাদরী  ইউরোপীয় কবিতার একনিষ্ঠ অনুরাগী ছিলেন। বিশেষ করে ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার এবং আধুনিক ইংলিশ কবিগন তাঁকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছিলো।একারণে তাঁর কাব্য ভাবনায় ঐসব কবির প্রভাব ছিলো সুদুরপ্রসারি। পাশ্চাত্য কবিদের এই প্রভাব কাদরী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, "একবার শার্ল বোদলেয়ার প্রেরিত এক পিপে সুরা আমি / পেয়েছিলাম কৈশোরে পা রেখে,/রিল্কে  পাঠিয়েছিলেন কিছু শিল্পিত গোলাপ /এজরা পাউন্ড দিয়েছিলেন অনেক ডলার/এবং একটি গ্রীক মুদ্রা।"

(টাকাগুলো কবে পাবো?,তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)। 

 

        বাংলা ভাষার যারা প্রধান কবি,তাদের অধিকাংশই  মূলত  গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন। কর্মসূত্রে বা অন্যান্য কারণে পরবর্তী জীবনে তারা শহরের বাসিন্দা হয়েছেন।ফলে শহর বা নাগরিক  পরিমন্ডলে অবস্থান করলেও তাদের জীবনের অন্তর্মূল থেকে গ্রাম বা গ্রামের  জীবনাচরণ একেবারে মুছে যায়নি।কিন্তু বিরল কিছু ব্যতিক্রমদের মধ্যে শহীদ কাদরী অন্যতম, যাদের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা সবকিছুই নগর কেন্দ্রিক। এবং এই নগর সাধারণ কোনো মফস্বল শহর নয়। একসময়ের  ব্রিটিশ ভারতের   রাজধানী এবং বাংলা শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির প্রাণ কেন্দ্র কলকাতা নগরীতে শহীদ কাদরীর জন্ম। এবং শৈশবের প্রথম দশ বছর তার এই নগরীতেই অতিবাহিত হয়। পরবর্তীতে উদ্বাস্তু হিসেবে চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব  বাংলার রাজধানী ঢাকায়। সেই সময় ঢাকা কলকাতার মতো বিকশিত নগর হয়ে ওঠেনি বটে তবে সেই প্রস্তুতি  পুরোদমে চলছিলো। আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়,কলকাতার যে মহল্লায় শহীদ কাদরীর পারিবারিক বসবাস,সেই পার্ক সার্কাস ছিল কলকাতার ব্যস্ততম ও প্রাণবন্ত এক সড়ক যা রেস্তোরাঁ, পাব ও শপিংয়ের জন্য ছিলো সুপরিচিত। অর্থাৎ পরিপূর্ণ একটি নাগরিক আবহে তাঁর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা।   অন্যদিকে ঢাকার যে এলাকায় তার পরিবার নতুন আবাস স্থাপন  করে, সেই দিলকুশাও ছিলো ঢাকার একেবারে প্রাণকেন্দ্র এবং ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত গড়ে উঠছিলো। সুতরাং পরিপূর্ণভাবে   নগরের মানুষ ছিলেন শহীদ কাদরী। একারণে   শহীদ কাদরীর কাব্যরুচি  গড়ে ওঠার পেছনে নগরে বসবাসের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে ভূমিকা রেখেছে। আমাদের আরেকজন প্রধান কবি শামসুর রাহমানেরও জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা নগরে। কিন্তু শামসুর রাহমানের জন্ম এবং শৈশবের যে ঢাকা, তা ছিলো ঘিঞ্জি  অলিগলি সম্বলিত  অবিকশিত এক শহর যা তখনও মেট্রোপলিটন নগর হয়ে ওঠেনি। ১৯৭৮ সালে কবি শহীদ কাদরী তৎকালীন পূর্ব জার্মানির বার্লিন শহরে গমন করেন। কিন্তু বিদেশে তাঁর যে নিরাপদ, সুস্থির জীবন ছিল তা নয়। তারপরও তিনি দেশ ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। শহীদ কাদরী ছিলেন আজন্ম বোহেমিয়ান। এবং তিনি মনে করতেন এটাই শ্রেষ্ঠ জীবন। বার্লিনে মাত্র তিন মাস কাটানোর পর লন্ডনে চলে আসেন তিনি। লন্ডনে চার বছর বসবাসের পর কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন। ১৯৮২ সালে পূনরায় লন্ডনে চলে যান। তারপর আমেরিকার বোস্টন। বোস্টনে অতিবাহিত হয়  তার জীবনের

 উল্লেখযোগ্য একটি সময়, প্রায় বিশ বছর। এবং জীবনের শেষ দুই বছর (২০০৪ থেকে ২০০৬) নিউইয়র্কে আবাস গাড়েন তিনি। ২০০৬ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে তাঁকে তাঁর যৌবনের  ঢাকায়  নিয়ে আসা হয়। তাঁর শেষ শয্যা হয় মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে।

কাদরীর জীবন পরিক্রমায় একটা বিষয় স্পষ্ট যে, তিনি পরিপূর্ণভাবে নগরের মানুষ। কলকাতা, ঢাকা ছাড়িয়ে উন্নত বিশ্বের বড় বড় কসমোপলিটন নগরে তিনি বিচরণ করেছেন।

 

       পঞ্চাশোত্তর বাংলা কবিতায় আধুনিক মনন ও জীবনবোধ সৃষ্টিতে কাদরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আধুনিক নাগরিক জীবনের সুখ- দুঃখ,হতাশা, ক্লান্তি, প্রেম এবং স্বদেশ চেতনার  পাশাপাশি বিশ্ব নাগরিক বোধের সম্মিলন ঘটে তাঁর কবিতায়।

       একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়,বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে একমাত্র শহীদ কাদরী ছিলেন  সম্পূর্ণরুপে নাগরিক চৈতন্যে লালিত কবি।তাঁর এই নাগরিকতা অন্য কারও সাথে তুলনীয় নয়।যেমন শামসুর রাহমান কেও নাগরিক কবি বলা হয়। কিন্তু তাঁর নাগরিক চৈতন্যে বৈশ্বিক নগরবীক্ষার বিস্তার নেই।আধুনিক নগর-যন্ত্রণার অনুরননও সেখানে অনুপস্থিত। তাঁর নগর ভাবনা মূলত আবহমান ঢাকার কিংবদন্তি এবং ঐতিহ্য লালিত।

 

শহীদ কাদরী [জন্ম : ১৪ আগস্ট ১৯৪২-মৃত্যু : ২৮ আগস্ট ২০১৬]

  অবশ্য শামসুর রাহমানেরও আগে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মধ্যে এক নাগরিক কবির বৈশিষ্ট্য আমরা খুঁজে পাই।কলকাতা নগর ছিলো তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র। এখানেই তাঁর জন্ম,বেড়ে ওঠা,শিক্ষাদীক্ষা এবং কর্মক্ষেত্র। শিক্ষা, জ্ঞান, আচরণে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ  নাগরিক। তাঁর  কবিতায় কলকাতা নগরের নিষ্ঠুর চিত্র ফুটে উঠেছে। শহীদ কাদরীর কবিতায় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্য ভাবনার একটা আবহ আমরা লক্ষ্য  করি। কিন্তু সেখানেও প্রার্থক্য আছে। যেমন সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় তৎসম  শব্দের আধিক্য সহজে চোখে পরে। অন্যদিকে কাদরী অত্যন্ত   সাবলীলভাবে তদ্ভব,প্রচলিত মুখের বুলি এমনকি ইংরেজি শব্দের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে কবিতার দিগন্ত প্রসারিত করেছেন।

 

     শহীদ কাদরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ' উত্তরাধিকার' প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। ঐ গ্রন্থের 'নপুংশক সন্তের উক্তি' কবিতায় তাঁর সেই সময়ের উন্মুল,ভবঘুরে   জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে  একজন আউট সাইডার হিসেবে পরিপার্শ্বের সঙ্গে অভিযোজনে অক্ষম তিনি। অচেনা পরিবেশে তাঁর একাকীত্ব এবং শেকড়হীনতা তাঁকে সবসময় তাড়িত করে। কবির এই সময়ের মানসিক যন্ত্রণার পরিচয় ফুটে উঠেছে এভাবে:

সুপ্রচুর বিমুক্ত  হাওয়ায় কেন তবে কষ্টশ্বাস?

কেন এই স্বদেশসংলগ্ন আমি, নিঃসঙ্গ, উদ্বাস্তু,

জনতার আলিঙ্গনে অপ্রতিভ, অপ্রস্তুত, অনাত্মীয় একা

আঁধার টানেলে যেন ভূ-তলবাসীর মতো, যেন

সদ্য উঠে -আসা কিমাকার বিভীষিকা নিদারুণ!

আমার বিকট চুলে দুঃস্বপ্নের বাসা?

(নপুংশুক সন্তের উক্তি,উত্তরাধিকার)।

        কাদরী দশ বছর বয়েসে উদ্বাস্তু হিসেবে ঢাকায় আসেন, ১৯৫২ সালে। তাঁর শৈশব, যৌবন ঢাকাতেই কেটেছে। তারপরও ছিন্নমূল জীবনের গ্লানি এবং জীবনের অনিশ্চয়তা তাঁকে স্বস্তি দেয়নি। ছাব্বিশ বছরের ঢাকা বাস পেছনে ফেলে তিনি ১৯৭৮ সালে দেশ ছেড়ে প্রবাসে চলে যান। কী ছিলো তাঁর দেশ ছেড়ে দীর্ঘ প্রবাস জীবনের  পেছনের কারণ? তাঁর  চাওয়া কি খুব বেশি কিছু ছিলো?

এ বিষয়ে তিনি বলেছেন,

"দু টুকরো রুটি কিংবা লাল শানকি ভরা

এবং নক্ষত্র কুচির মতন কিছু লবনের কণা

দিগন্তের শান্ত দাওয়ায় আমাকে চাওনি তুমি দিতে -

তাই এই দীর্ঘ পরবাস।"

(তাই এই দীর্ঘ পরবাস, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও)।

 

       কবির  চাহিদা খুব বেশি কিছু ছিল না। কিন্তু প্রিয় স্বদেশ এটুকুও দিতে পারেনি কবিকে। সুতরাং স্বদেশের প্রতি কবির যে অভিমান তা একেবারে যুক্তিহীন নয়।

       শহীদ কাদরীর কবিতা চিত্রকল্পময়। প্রতীক, উপমা এবং রূপকের সাহায্যে তিনি তাঁর দেখা ঘটনার অন্তর্নিহিত রহস্যের সন্ধান করেন। এবং ঘটনার  গভীর থেকে তুলে আনেন ভিন্নতর ব্যাখ্যা সূত্র। আপাতত সরল সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে বিপুল তাৎপর্যময়।  কাদরীর একটি অসাধারণ কবিতা 'বৃষ্টি,বৃষ্টি '।

নগরে বৃষ্টি কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার না। একেবারে চিরচেনা, সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এই বৃষ্টিকে কবি গভীর তাৎপর্যময় করে তুলেছেন। অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের মতো নগরে হঠাৎ বৃষ্টি নামে। এবং এটা খুবই নৈমিত্তিক ব্যাপার। এই বৃষ্টিকে উপলক্ষ  করে শহীদ কাদরী অভূতপূর্ব কল্পনা শক্তি এবং নিপুণ শিল্প কুশলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

"সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো। ঘর ফেরা রঙিন সন্ধ্যার ভিড়ে

যারা ছিল তন্দ্রালস দিগ¦দিক  ছুটল, চৌদিকে

ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার মতো যেন বা মড়কে

শহর উজাড় হবে- " (বৃষ্টি, বৃষ্টি :উত্তরাধিকার)।

 

      দেখার কী অসাধারণ কাব্যময়তা! চিরাচরিত চেনা সাধারণ বৃষ্টিকে তুলনা করেছেন সন্ত্রাসের সঙ্গে। আর মানুষ যে ভয়ে দিগি¦দিক ছুটে পালাচ্ছে,এটাই স্বাভাবিক, নতুন কিছুই নয়। কিন্তু এই দৃশ্য দেখে কবির ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার ভয়ে পালানোর কথা মনে পড়ে যায়। শহরে কোনো  দুর্যোগ ঘটলে আরশোলা এভাবেই ছুটে পালায়। কিন্তু নগরের প্রতি বিক্ষুব্ধ, নিঃসঙ্গ কবি তাই এই সাধারণ, তুচ্ছ ঘটনাকেও তীর্যক দৃষ্টিতে দেখেছেন। এর মধ্য দিয়ে নগর জীবনের প্রতি তাঁর হতাশা এবং ক্ষুব্দতার বহিঃপ্রকাশ ঝরে পড়েছে।

বৃষ্টির অন্ধকারে  নগ্ন পায়ে একাকী রাতে কবি হেঁটে চলেছেন। প্রবল হাওয়ায় তাঁর শার্ট যেন নৌকার পালের মত স্ফীত। নিঃসঙ্গ কবি বৃষ্টির জোয়ারে  দিকভ্রান্ত। চারদিকে কোনো জনপ্রাণীর  সারা নেই। জলোচ্ছাসের ভয়াল আর্তস্বর এবং বাতাসের চিৎকারে কবি দিশেহারা। জলের জোয়ারে কোন গন্তব্যে কবি ভেসে যাবেন তা জানা নেই তাঁর।

"এই ক্ষণে আঁধার শহরে প্রভু, বর্ষায়, বিদ্যুতে

নগ্নপায়ে ছেঁড়া পাতলুনে  একাকী

হাওয়ায় পালের মতো শার্টের ভেতরে

ঝকঝকে, সদ্য, নতুন নৌকার মতো একমাত্র আমি,

আমার নিঃসঙ্গে তথা  বিপর্যস্ত রক্ত মাংসে

নূহের উদ্দাম রাগী গরগরে গলা আত্মা জ্বলে

কিন্তু সাড়া নেই  জনপ্রাণীর অথচ

জলোচ্ছাসে নিঃশ্বাসের স্বর, বাতাসে চিৎকার,

কোন আগ্রহে সম্পন্ন হয়ে, কোন শহরের দিকে

জলের আহ্লাদে আমি একা ভেসে  যাবো।"

(বৃষ্টি,বৃষ্টি :উত্তরাধিকার)।

       এখানে  কবি নগরের বৃষ্টিকে  জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চেয়েছেন। বৃষ্টি,বৃষ্টি কবিতায় প্রবল বৃষ্টি আর ভয়াল জলোচ্ছাসের মধ্যে  কবি- জীবনের অনিশ্চয়তাকে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করেছেন।

      শহীদ কাদরী এক নিঃসঙ্গ নগর পথিক। ঢাকা নগরের ফুটপাত থেকে ফুটপাতে, গলি থেকে গলিতে বিজ্ঞাপনের আলোয় তিনি ঘুরে বেড়ান। বিপর্যস্ত তাঁর মাথার চুল। তাঁর সার্বক্ষণিক  সঙ্গী তৎকালীন  ঢাকার চেপে বসা  বেকারত্ব,অনিশ্চিত জীবনের হতাশা, উন্মুল জীবনের নি:সীম যন্ত্রণা। নগরের  এক ভরা বর্ষায় একটি দৃশ্যকল্প কবি বর্ণনা করেছেন যেখানে তাঁরই মতো এক নি:স¦ঙ্গ মানুষের ছবি চিত্রিত হয়েছে।

"কনিয়াকের করুণ লেভেলহীন শূন্য বোতল

সামনের টেবিলে রাখা, বাঁ-হাতে শস্তা কড়া সিগরেট,

লোকটা ফতুর  হয়ে বসে আছে, চুপচাপ, একা

যেন কোন ভয়ঙ্কর কয়েদখানার  সতর্ক প্রহরী। "

(ভরা বর্ষায় :একজন লোক,উত্তরাধিকার)।

 

      এখানে  তৎকালীন ঢাকা নগরের অন্তঃসারশূন্যতা এবং অর্থহীন জীবনের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন কবি। আরেকটি কবিতায় আমরা দেখি অন্ধকার রাস্তার মোড়ে দন্ডায়মান গন্তব্যসন্ধানী, চালচুলাহীন একদল   যুবককে, কবি নিজেও যাদের গোত্রভুক্ত - তাদের করুণ  প্রশ্ন ছিলো :

ধেই ধেই ধেই করতে করতে বলো

পুরোনো বিধ্বস্ত এই হাড্ডি- মাংস নিয়ে

দাঁড়াবো কোথায় নান-সেঁকা চুলার ভেতর?

(ধেই ধেই ধেই করতে করতে যাবো,উত্তরাধিকার)।

 

        কবির  যৌবনের সেই উত্তাল সময়ে এরকম অজস্র বিপন্ন মানুষের দাঁড়াবার কোনো জায়গা ছিলো না। তাদের জীবন ছিলো যেন অভিশপ্ত। কোনোমত খেয়েপড়ে বেঁচে থাকাই ছিলো সবচেয়ে বড় দায়। তবে এর মাঝেও সীমিত মানুষের জন্য জৌলুসেরও কোনো অভাব ছিলোনা।তবে সেইসব  জৌলুস,চাকচিক্য কবিকে কে আকৃষ্ট করেনি। ভাগ্য অন্বেষণে আগত মানুষের ভীড়ে  ঢাকা তখন গিজগিজ করছে। বাস স্টপেজ,রেল স্টেশন, ফুটপাতে ছিন্নমূল মানুষের সমারোহ। কিন্তু মানুষের এই ভীড়েও কবি একাকী। ঢাকা নগরীর রাস্তার দুপাশে সারি সারি দোকান বাহারি জামা-কাপড় আর অন্যান্য বিলাসী পণ্যে ভরপুর। সেসব পণ্যের পাশ দিয়ে কবি হেঁটে চলেন। কিন্তু কিছুই কেনেন না। এমনকি অন্ধকার রাস্তার রূপবতী কোনো নারীর আহবানও কবি উপেক্ষা করে যান অবলীলায়।

" চারিদিকে রঙবেরঙের জামা কাপড়ের দোকান

মদিরার চেয়ে মধুর সব টেরিলিনের শার্ট

ভোর বেলার স্বপ্নের চেয়ে মিহি সূক্ষ সুতোর গেঞ্জি

স্বপ্নাক্রান্ত চালকের  হাতেরও অধিক অস্থির

রজ্জুতে-গাঁথা রাশি রাশি পুঞ্জ,পুঞ্জ লাল, নীল উজ্জ্বল রুমাল

মেঘলোকে মজ্জমান রেস্তোরাঁর  দ্বারগুলো খোলা-

আমি অবহেলে চলে যাবো, যাই

আঁধাররাস্তার রানী চকোরীর মতো বাঁকা চোখে দ্যাখে

আমি কিছুই কিনবো না। "

(আমি কিছুই কিনবো না, উত্তরাধিকার)।

 

       নগরের জীবন বৈষম্যময়। একদিকে যেমন জীবনের ন্যূনতম দায় মেটাতে অক্ষম মানুষের নিষ্ফল  হাহাকার অপরপ্রান্তে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের জন্য গড়ে উঠেছে ঝলমলে  বিপনি বিতান, সিনেমা হল। মেধাহীন মেকি মানুষে মুখর এই নগরী। শুধুমাত্র স্বপ্নকে সাথে নিয়ে কবি কখনো বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকার রাতে, পথচারীর কোলাহলের ভিড়ে, বিপনি বিতানের পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যান। এই যে শহরময় কবির পরিভ্রমণ,এখানে তিনি একা, বিরামহীন এই যাত্রায় তাঁর সঙ্গে অন্যকেউ নেই। একজন নিঃসঙ্গ নগর পথিক হিসেবে শহীদ কাদরীর মহাকাব্যিক পরিভ্রমণ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আধুনিক বিশ্বের ঝলমলে কসমোপলিটন নগর থেকে নগরে অব্যাহত ছিলো। লন্ডন, বার্লিন, বোস্টন থেকে নিউইয়র্কে এসে অবশেষে এই যাত্রা শেষ হয়।

 

আনোয়ার মল্লিক

ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল

বগুড়া বিভাগ, জলেশ্বরীতলা, বগুড়া।

মোবাইল- ০১৭১৫-৩৭৮০৭৫

 



সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান