আজ ৮ এপ্রিল কবি শোয়াইব জিবরানের জন্মদিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন সিলেট জেলার মৌলভীবাজারের আজমত শাহ্ কুটিরে তাঁর জন্ম হয়েছিল। সাহিত্য বার্তার পক্ষ থেকে এই কবি, লেখক ও শিক্ষাবিদের জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
বাংলা সাহিত্য জগতে শোয়াইব জিবরানের উত্থান মূলত তাঁর প্রথম প্রকাশিত ‘‘কাঠ চেরাইয়ের শব্দ’’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে। আজও তিনি কাঠ চেরাইয়ের কবি নামে সমধিক পরিচিত। আজ তাঁর ৫৫তম জন্মদিনে সে গ্রন্থটি প্রকাশের গল্প প্রকাশিত হলো।
‘কাঠ চেরাইয়ের শব্দ’ যেভাবে লেখা হয়েছিল
শোয়াইব জিবরান
পাখিদের ভাষা জানতেন নবী সলেমন। তিনি কি বৃক্ষের ভাষাও জানতেন? এ প্রশ্নের উত্তর বাইবেলে গসপেলকাররা লিখে রেখে যান নাই। কিন্তু এখন আমরা এ কথা জানি পৃথিবীর সকল প্রাণী ও উদ্ভিদের একটিই আকুতি—বেঁচে থাকা আর বংশ বৃদ্ধি। বোগেনভিলিয়া গাছে পানি দিলে সে ফুল ফোটায় না। ফোটায় যখন তার গোড়ার পানি শুকিয়ে যায় আর পাতায় সূর্যের খরতাপ পড়ে। সে যখন বুঝতে পারে, তার অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়েছে। সে মারা যাবে। তাই তাকে বংশ রেখে যেতে হবে। তখনই সে ফোটায় ফুল, লাল। আর কে না জানে, ফুল তো গাছের যৌনদ্বার। সে রঙিন হয় ভ্রমরকে আকৃষ্ট করার গোপন ইচ্ছায়। যেন বংশ রেখে যেতে পারে।
রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব একবার বলেছিলেন, এসেছিস যখন দাগ রেখে যা। লিখে যাওয়া তো দাগ রেখে যাওয়ারই বাসনা। তাঁর এক শিষ্য তাকেঁ জানিয়েছিল, ঐ লোক তো ভাল লিখতে পারো না, প্রভু। তিনি হাহাকার করে ওঠে বলছেন, না না ও লিখুক। ও একটা মনকে ধরিতে পারিয়াছে!
লেখা তো ধরতে পারারই বয়ান। প্রথমত নিজের মনকে ধরতে পারা। তারপর পাঠকের মনকে ধরতে পারা। মানুষ লিখে নিজেকে ধরার আর এর মাধ্যমে অপরকে ধরার বাসনায়। সে লেখে প্রথমত আপনার আনন্দ—বেদনায় তারপর বলে, দেখো আমার হৃদয় কত লাল? আমাকে ভালবাসো, আদর করো। আমাকে পড়ো। মনোযোগ দাও।
জীবনের ঠিক কোন তীব্র তাড়নায় প্রথম কবিতা লিখেছিলাম তা আজ আর ঠিক মনে নাই। তবে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কাঠ চেরাইয়ের শব্দে’র প্রথম কবিতা, নাম কবিতাটি লেখার স্মৃতি মনে আছে।
জন্মেছিলাম, আশ্চর্য ইডেন উদ্যানে— মৌলভীবাজার জেলার সাং সিদ্ধেশ্বরপুরে। বাড়ির পশ্চিমে সবুজ ঢেউ খেলানো চা বাগান, দক্ষিণে শ্রীমঙ্গলের উঁচা উঁচা টিলার নীল রেখা, পুবে বিবি সখিনার কাকচক্ষু দিঘি আর উত্তরে সারি সারি ঘর, স্বজনের। গাছ গাছালিতে ভরা ছিল চারপাশ, পুরো বাড়ি। এই বৃক্ষ সারি, তার ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া পথ, কত পথের গল্প নিয়েই তো এ জীবন।
আর তার বাড়ির পেছনেই আমার আসা যাওয়ার পথের ধারে বসানো হয় সে করাতকল। কিন্তু আমার প্রথম প্রেমের মানুষটি আর সেখানে নেই। এক সন্ধ্যারাতে ঘোরের ভেতর ফিরছি— বাড়ি, অনেকদূর শহরের হোস্টেল হতে, অনেকবার গাড়ি বদলাতে বদলাতে। শেষ নেমেছি গ্রামের বাজারে আর সেখান থেকে ক্ষুধা ক্নান্ত মন নিয়ে ফিরছি বাড়ি হেঁটে হেঁটে। পথের পাশেই সারি সারি কবর। কত মানুষদের। তারমাঝে একটি কবর আমার প্রিয়, প্রেমিকার পিতার। তার পাশ দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে আসতে মনে ভাসছে তাঁর পিতৃহারা ম্লানমুখ আর একবাঁক পরেই কানে আসতে থাকে কাঠ চেরইয়ের শব্দ, থেকে থেকে। আর দেখি দূরে উড়ছে জোনাকিরা, মুখে মুখে নীল মৃদু আলো নিয়ে, কিন্তু কিছু আলো লালচে মিটিমিটি কাঁপছে কাঠ চেরাইয়ের শব্দের সাথে। কেননা সেগুলো বাধা আছে পাটাতনের মাচার সাথে। তারা সব লণ্ঠন, কেরোসিনের গন্ধমাখা।
মানুষেরা তো কত গল্পই বলে। সব গল্পের, সব ডিঠানের মানে জিজ্ঞাসা করতে পারি না। পাছে মুচকি হাসে। ঠারে ঠারে জিকাই। তারা বলে, শহরে চলে গিয়েছে তারা। আর তাকে নাকি বিয়েও দিয়ে দিয়েছে অন্যপুরুষের সাথে। সে সকল গল্প নিয়ে ফিরতে থাকি করাতকলের পাশ দিয়ে, বাড়ি। তারপর আরো আরো দূরের শহরে। কিন্তু সে কাঠ চেরাইয়ের শব্দ আমার মাথা থেকে যায় না। চেরাই হতেই থাকে একটানা, মগজের ভেতর, কলিজার ভেতর। তার অনেকগুলো বছর পর এক বিকেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আল বেরুনি হল থেকে সকলে বেরিয়ে গেছে হাঁটতে আমি জ্বরমগ্ন শুয়ে আছি ১১০ নম্বর কক্ষে আর তখনই লিখে ফেলি আমার কাঠ চেরাইয়ের শব্দ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটি—
পাটাতনে শুয়ে আছে কাঠ/কাঠ চেরাইয়ের শব্দ, তোমাদের বাগান বাড়ি।/আমার বুকের ভেতর লোহার করাতদাঁত/কাঠের শরীর ফালি ফালি... তুমি কারো ঘরের ভেতর গোছল করো, পাশ ফিরে শোও/আমার ঘুমের ভেতর কাঠের গুঁড়া, স্বপ্নের বিষয়/তোমাদের বাগান বাড়ি।/ ... কাঠ চেরাইয়ের শব্দ, কাঠ কাঠ, ফালিফালি। (কাঠ চেরাইয়ের শব্দ)
কাঠ চেরাইয়ের অধিকাংশ কবিতা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আল বেরুণী হলে বসে লিখা। লাল ইটের মোটা মোটা দেয়ালের দুর্গের মত হলটির নীচতলার ১১০ নম্বর রুমটি ছিল কবিতা লেখারই উপযোগী। জানানাল সামনে একপাশে বিস্তীর্ণ বিশাল মাঠ আর অপর পাশে ঝিল। ঝিলের পারে মেয়েদেল লাল হল। বিকেলে আমাদের হলের প্রায় সবাই হাটতে বের হয়ে যেত। আমি নির্জন সে হলে গুহার সন্ন্যাসীর রূপ ধারণ করতাম। বর্ষায় বৃষ্টি হলে ঝিল আর মাঠের দৃশ্য অপরূপ হয়ে উঠত। আর শীতের কুয়াশায় রহস্যময়। এই অপার্থিব দৃশ্যসমূহের মাঝখানে আমি ডুব দিতে পারতাম নিজের মনের গহীনে। এই কবিতাগুলো লিখতে লিখতেই এক সময় আমার শ্রমণ জীবন শেষ হয়ে আসে। কিন্তু এই কবিতাগুলো বই আকারে বের করবে কে? যদিও এ কবিতাগুলোর অধিকাংশ সে সময়ের বিভিন্ন লিটলম্যাগগুলোতে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। তখন কাজ নিয়েছি একটি পত্রিকা অফিসে। বেতন যা পাই একা থাকা খাওয়ার খরচই ওঠে না। বই বের করব কি জীবন সামলেই কুল পাই না।
এরমধ্যে একদিন পত্রিকায় এক অদ্ভুত বিজ্ঞাপন বের হয়। সরকার দেশের তরুণ লেখকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। তাদের বই প্রকাশ করবে আর উপরি ছয়মাস প্রতিমাসে তিন হাজার করে ভাতাও দেবে। সে সময়ে তিন হাজার টাকা বেশ টাকা। বিরাট সুযোগ। আমরা পশ্চিমের ক্রিয়েটিভ রাইটিং প্রোগ্রামের খবর জানতাম। এটা একদম নিজের দেশে। আর সে অভাবের সময়ে। যথারীতি কবি বন্ধুরা মিলে দল বেঁধে আবেদন করলাম। বন্ধুদের মধ্যে আমি, চঞ্চল আশরাফ, মুজিব ইরম, জেনিস মাহমুন আর কবির হুমায়ুন প্রথম ব্যাচেই চান্স পেয়ে গেলাম। তারপর টানা ছয়মাস আক্ষরিক অর্থে টাকার বিনিময়ে আড্ডার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। কাজের কাজ যেটা হলো সেটা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। তখন সবে মাত্র ঢাকার প্রকাশনা জগতে কম্পিউটার কম্পোজের ব্যবহার শুরু হয়েছে। ফকিরাপুলে আমরা জুতা খুলে কম্পিউটার রুমে ২/১ বার ঢুকেছি। হাত দিয়ে ধরার সাহস হয় নাই। দোকানদাররা বলতেন ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে যাবে। ভয়ে ভয়ে দেখতাম। বাংলা একাডেমি সে সময় আমাদের প্রত্যেককে নতুন একটি করে নতুন ম্যাকিনটস কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে দিল। এমএস ওয়ার্ড, পেজ মেকাপের প্রশিক্ষণ দিল। আমরা নিজেদের হাতে নিজেদের লেখাগুলো কম্পোজ করলাম। পেজ মেকাপ দিলাম। সে এক শিহরণ জাগানো অনুভূতি। যেন নিজের সন্তানের সিজার নিজ হাতে সম্পন্ন করা। পাণ্ডুলিপি তৈরি হলো কবি রফিক আজাদ ও মুহম্মদ নূরুল হুদার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। পাণ্ডুলিপি তৈরির মাঝখানে চলতে থাকলো পাঠ পর্ব। আমরা এক এক দিন এক একজন কবি নিজের কবিতাগুলো বাকী ২৯জন কবি লেখকসহ প্রশিক্ষক বিখ্যাত কবিদ্বয়ের আসরে পড়ে শোনাতে লাগলাম। তারপর হলো মুক্ত আলোচনা। তারপর পাণ্ডলিপির আবার সংশোধন। চূড়ান্ত হলে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য পাঠানো হলে সে প্রকল্পের বাইরের একজন কবির কাছে। আমার পাণ্ডুলিপি গেল কবি আসাদ চৌধুরীর কাছে। সেটা অবশ্য আমি জানতাম না। একদিন তিনিই আমাকে তাঁর অফিস কক্ষে ডেকে নিলেন। পান খেতে খেতে খুবই সুন্দর করে বললেন কিছু পরামর্শ। তিনি পাণ্ডুলিপিটির উচ্চ প্রশংসা করে বললেন, দুই একটি কবিতা বাকী কবিতাগুলোর মানের নয়। সেগুলো বাদ দেবো কীনা ভেবে দেখতে পারি। তারপর তিনি লম্বা আড্ডা দিয়েছিলেন।
শৈশবে আমাদের স্বপ্নের শিল্পি ছিলেন হাশেম খান। কেননা পাঠ্যবইয়ে তাঁর আঁকা ছবি দেখে দেখেই বড় হয়েছিলাম। কিন্তু তখন প্রচ্ছদ শিল্পি হিসেবে দেশে ক্রেজ ছিলেন শিল্পি কাইয়ুম চৌধুরী। অনেক প্রতিষ্ঠিত কবি লেখক না হলে তাঁকে দিয়ে প্রচ্ছদ আঁকানো কারও কল্পনায়ও আসত না। একদিন সকালে শুনলাম কাঠ চেরাইয়ের শব্দ কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকছেন কাইয়ুম চৌধুরী। কী যে ভাল লেগেছিল তখন। তিনি দারুণ একটি প্রচ্ছদ আঁকলেন। সে সময় ব্যতিক্রম বাদে প্রতিষ্ঠিত কবি লেখকদেরও ৩০০ কপি বই ছাপাতে প্রকাশকরা ভয় পেতেন। বাংলা একাডেমি আমার বই ছাপালো তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি। বইটির কবিতাগুলো লেখা ও বই আকারে দাঁড় করানোর সে সময়ে সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল আমার সহপাঠী ও ঘনিষ্টবন্ধু নব্বইয়ের বিখ্যাত কবিতাপত্র কিউপিড সম্পাদক আজিজুন মাগফুরা। সে সময়ের আড্ডাগুলোতেও মাঝে মাঝে এসে যোগ দিত। প্রথম কপিটি তার হাতেই তুলে দিয়েছিলাম। আমার বন্ধুটি তার কয়েক বৎসর পরই অকাল প্রয়াত হয়।
বইটি প্রকাশ পেয়েছিল বইমেলারই কয়েক মাস আগে। বই মেলায় তরুণ লেখকদের জন্য আলাদা স্টল দেয়া হলো। পুরো মাস জুড়ে চলল হল্লা। লিটলম্যাগ চত্বরেও ছড়ালো সে হল্লা। সব কিছু মিলিয়ে আমার প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের স্মৃতিটি ছিল বেশ মিষ্টান্ন। কিন্তু এগুলো বড় পাওয়া ছিল না। বড় পাওয়া ছিল পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া। বইটি সে সময়ের তরুণ কবি, বিশেষত লিটলম্যাগের কমীর্দের কাছে পাঠপ্রিয়তা পেয়েছিল। বইটি পরবতী প্রজন্মের তরুণদেরও আগ্রহের কারণ হয়েছিল। ফলত প্রকাশের বিশ বৎসরেরও অধিক সময় পর বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেছিল বহেড়াতলার লিটলম্যাগ চত্বরের তরুণরা।
কাঠ চেরাইয়ের শব্দ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো গভীর নিমগ্নতার ভেতর লিখেছিলাম। তখন কবিতাই একমাত্র ধ্যান ছিল। ফলত বোধ প্রকাশের সম্ভবত একটি অন্তশীলা স্তরে পৌঁছাতে পেরেছিলাম। পাণ্ডুলিপিটিও সাজিয়েছিলাম বিভিন্ন পর্ব ভাগ করে ধ্রপদী সাহিত্যের গঠন দ্যোতনায়। আর সিরিয়াস পাঠকরাও সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন সে কাব্যকরণ কৌশলের সাথে।
কাব্যচর্চার এ পর্যায়ে এসে অনুভব করি শিল্পের সাধনা কখনও খণ্ডকালীন হয় না। এ এক নিরন্তর সাধনার প্রক্রিয়া। এক দীর্ঘ নিরন্তর, মগ্ন সাধনার ফসল ছিল কাঠ চেরাইয়ের শব্দ। ফলত পাঠক যেমন শোয়াইব জিবরান বলতেই কাঠ চেরাইয়ের কবি মনে করেন আমিও তেমনি এই কাব্যগ্রন্থটিকে উতরে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা করে চলি।
