সুশান্ত হালদারের গুচ্ছ কবিতা
যদি প্রেম দাও
কী ভেবে যে বলেছিলাম তারে
দেশে দেশে যুদ্ধ
কেনইবা এলে এই শান্তির নিকেতনে?
এখানে ডুবো হাঁস সিন্ধু সভ্যতা খুঁজে ফেরে হাকালুকি হাওরে
হো-চি-মিন স্বাধীনতা পেলে
ঢেউ ভাঙা নদীও সবুজ ক্ষেতে আছড়ে পড়ে,
তুমি কী দেখ নাই
বনলতা দ্বীপে জীবনানন্দ হেঁটে যায় উদাসী বায়ে
ধানকাটা আশ্বিনে
যদিও আমাদের বিচ্ছেদ হয়েছে হৈমন্তী বিরহে
তথাপি প্রেম ফুটে আছে দেখ শীতার্ত ডেফোডিল ফুলে,
কুয়াশাসিক্ত সকাল যদি আসে এই ফাল্গুন উপচায়ে ধানসিঁড়ি তীরে
মনে রেখ
এখানে চৈত্রের ঝড়ে কালবৈশাখ আসে সুকান্ত বিদ্রোহে,
কী ভেবে যে বলেছিলাম তারে
যদি প্রেম দাও
মাটি চুমিয়ে পল্টন ঘেরা জিরো পয়েন্ট দাপিয়ে,
তবে এক প্লাটুন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে
আমিও কি চেঙ্গিস হবো না মঙ্গোল অধ্যুষিত যাযাবর ভূমিতে?
সাতচল্লিশের ফুঁসে উঠা বাংলাদেশ
পুত্র বলে ডেকেছ যখন.......
তোমাকে দিলাম
মরার দেশে বিকলাঙ্গ স্বাধীনতার অষ্টধাতুর ফলক-স্মৃতি-স্তম্ভ
সাধুজন যারা
জীবনানন্দ ভালোবেসে এসেছিল একদিন আর্য অনার্য দেশে
সাদা মরালের মতো ধবল কোন রাজহাঁস বেশে
আজ আর তাদের দেখি না
মাছরাঙা ঠোঁটে চিকচিক রোদের কুয়াশা-জলে,
তবে কি টগর ফোটা দেশে
আকালের বান ডেকেছে থরথর চৈত্রের ভাগীরথে?
ভালোবাসি সুরঞ্জনা,পরমহংস সাধু সন্ন্যাস বেশ
ফসল বিস্তৃত এই মধুসুদন খ্যাত জীবনানন্দ দেশ,
পাহাড়ে পাহাড়ে যে মানুষ ঘুরে এসেছে হিজলতলী,অবশেষ
সে ত জানে
এ আমার দুর্ভিক্ষ কবলিত জয়নুলের সাতচল্লিশের ফুঁসে উঠা বাংলাদেশ,
কি করে ভুলবো বলো-
স্বাধীন বাংলায় অযাচিত এই 'বিনোদ বিহারী' বিদ্বেষ?
অরণ্যবাস
যতবার মন্ত্র পড়ে গিয়েছি ঘরে
দেখি, এ আমার অরণ্যবাস;যত্রতত্র অধিগ্রহণ ঝড়ে
যত না প্রেমে তারচে' বেশি পুড়েছে বিচ্ছেদী অনলে
চিতার ভস্ম গায়ে মেঘে বলেছি, এ আমার বোধিবৃক্ষ বসুধাতলে
যতবার কাফের বলে তাড়িয়েছ যারে
সে এখন তোমারই আরাধনায় মন্দির উপাস্য কালবোধনের ঘরে
তাড়িত সময় উপচিয়ে দেখ
এসেছে 'মোহররম' বিষাদসিন্ধু রক্তাক্ত করে
যতবার নগ্ন হয়েছি, কাকচক্ষু জলে নিজেকে দেখেছি
এ আমার ভৈরবী সকাল
মহামন্ত্র বলে যে যোগী রাতের কান্না ভুলেছে
ভুলেছে শবনম রাত্রির উপমায়
ব্যথার বকুল যখন ঝরেছে কুয়াশার জলে,
অবগাহিত রাত্রি যেন জেগে উঠে শরীরে আমার কালকূট বিষ মন্থনে!
বিপন্ন রাত্রি বাস
বিপন্ন রাত্রি বাস
কুহকের ডাকে ভেঙেছে ঘুম,নদী সাঁতরিয়ে আসে কালনাগিনী সাপ
এরকম দেখেছে বাংলাদেশ, একাত্তরে
তুমি কি বলবে? জেনেছি তা
অভয়নগর যখন পুড়েছে দেবীদ্বার শ্মশানে
আমাদের কপাল তিন বাই চার
জোছনা পোড়া ফাগুনেও নিকষ কালো অন্ধকার পোড়খাওয়া করমচা সকাল,
নারীর মতো কোমল জেনেছি যারে
সে-ও দেখি মহামন্ত্র বলে সাপুড়ে দলে
নাগিনবীণে কড়ি চালে বেহুলার লখিন্দর-ঘরে,
তবে কি ভুলে যাব 'বাংলাদেশ' এই বিজয় উৎসব কালে?
তিলফুল কানে গুঁজে কে যায় রে পাহাড় ডিঙিয়ে সন্ধ্যামালতী গাঁয়ে
সে কি তুমি?
ভালোবাসি বলে যে কেঁদেছিল অঝোরে রক্তিম পতাকাতলে,
এ মাটি রবি ফসলের,কর্দমাক্ত বলে ছুঁড়ে ফেলেছ যারে
স্বাধীন স্বাধীন বলে সব ছেড়েছে 'বাংলাদেশ' পেয়ে!
এমন ত কথা ছিল না
এমন ত কথা ছিল না
ছুরির ধার পরখে
বেছে নিয়েছ আমারই বুক সহজে,
আসলে কাফের বলে ধিক্কার দিয়েছ যারে
সে-ই দেখ
তোমারই ঘরে মহররমের শেকল পরিয়েছে গোপনে,
এমন ত কথা ছিল না
দাম্ভিক রাজার মাহফিলে
আমাকেই দিতে হবে পরীক্ষা 'বুদ্ধং শরণং গচ্ছামে'
আসলে পেরেকবিদ্ধ দেয়ালে
সব রাজাই এখন রিসেট বাটন চেয়ারে,
এমন ত কথা ছিল না
জ্যান্ত মরায়
ফিরিয়ে দেবে প্রাণ বসন্ত আগুনে
আসলে মরেছি ত সেই কবেই
শরীরে যখন পচন ধরেছে রজকিনী বাসরে,
এমন ত কথা ছিল না
সংসদীয় প্রেমের বিলে
ওয়াক আউট হবে গনবিরোধী সব প্লেকার্ড ফেস্টুনে
আসলে প্রজ্ঞাপনের টেবিলে
আমারই নাম গুপ্ত করে লিখেছে দিন বদলের ধাউড়ে!
আমাদের ঘর এখন ফাঁকা
আমাদের ঘর এখন ফাঁকা,
একাত্তর লেখা দেয়ালে
এখন বাইসন গ্রাফিতি আঁকা
গোল টেবিলে
ক্ষতযুক্ত যে মানচিত্র রেখেছিল পিতা
সেখানে এখন নাটবল্টু,তারকাটা আর পেরেকের জটলা
হাতল ভাঙা চেয়ার
যেখানে ভগৎ সিং বসেছিল একদা
সেখানে এখন গজিয়ে উঠা হাজারো ঝোপঝাড়,গুল্মলতা
যে দেরাজে
জননী স্বপ্নে রাঙানো ছিল উজ্জ্বল এক নাক্ষত্রিক পতাকা
সেখানে এখন চৈত্র খরায় মাটি চৌচির শুষ্কতা,
আমাদের ঘর এখন ফাঁকা
একাত্তর লেখা দেয়ালে
সুবোধ আর আঁকবে না 'জয়নুল' সহসা!
